রিজার্ভের টাকা উদ্ধারে ইতিবাচক পদক্ষেপ

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির অর্থ উদ্ধারে মামলা দায়েরের ঘটনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, মামলার ফলে বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আইনগত ভিত্তি পেল। ফিলিপাইনের আদালত মামলার রায়ে ওই দেশের ব্যাংক কর্মকর্তাদের দায়ী করে শাস্তি দেয়ায় বাংলাদেশের পক্ষে রায়ের সম্ভাবনা বেশি।

এছাড়া এ মামলায় রায়ের মাধ্যমে অনেক বিষয় পরিষ্কার হবে। তবে মামলায় রায় বাংলাদেশের পক্ষে এলেও টাকা উদ্ধার সময়সাপেক্ষ বলে মনে করেন তারা।

যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. বাকী খলীলী এসব কথা বলেন।

উল্লেখ্য, রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনায় শুক্রবার নিউইয়র্কের আদালতে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই মামলায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংককে আসামি করা হয়েছে।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, মামলার বিষয়টি ইতিবাচক। ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ যখন টাকা দিতে অস্বীকার করছে, তখন মামলা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ ছিল না। আর মামলা করার আগে নিশ্চয়ই, এর আইনগত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আমাদের ধারণা এক্ষেত্রে যারা ভালো আইন বিশেষজ্ঞ তাদেরকেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ফলে রায়টি বাংলাদেশের পক্ষে আসবে, এ ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। দেরিতে মামলা করলে একটু সমস্যা হয়। তাই মামলাটি আরও আগে করলে ভালো হতো।

পিআরআই নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর যুগান্তরকে বলেন, মামলা দায়েরের ঘটনা ইতিবাচক। কারণ মামলা না করলে আইনি ভিত্তি তৈরি হয় না। এ ধরনের আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ঘটনারই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলা করতে হয়। সেদিক থেকে ঠিক আছে। কিন্তু টাকা আদায় কতটা সম্ভব, তা বলা মুশকিল। কারণ যারা টাকা নিয়েছে, সরকারিভাবে তদন্তের মাধ্যমে তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করতে হবে। মামলার পরও বাংলাদেশ ব্যাংককে আইনগত বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বাকী খলীলী মামলা দায়েরকে ইতিবাচক অখ্যায়িত করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, মামলা আগেই করা উচিত ছিল। এরপরও বলব দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পজেটিভ চিন্তা এসেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার অবসান হবে।

তিনি বলেন, যেহেতু ফিলিপাইনে একটি বিচার হয়েছে। ওই বিচারে দেশটির ব্যাংক কর্তাকে দায়ী করে শাস্তি দেয়া হয়েছে। সে কারণে মামলা হলে রায় বাংলাদেশের পক্ষে আসবে, সেটি স্বাভাবিক। টাকা আদায়ের বিষয়টি কঠিন হতে পারে। কারণ চুরির অর্থ সর্বশেষ কোথায় কার কাছে গেছে, তা এখনও পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি। তিনি বলেন, মামলা করার পর সে ব্যাপারে অবশ্যই সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে। ফলে অনেক কিছুই পরিষ্কার হবে।

জানতে চাইলে সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মামলার বিষয়টি ইতিবাচক। কারণ তিন বছরের মধ্যে মামলা করার কথা ছিল। তিন বছরের মধ্যেই মামলা হয়েছে। যেহেতু ফিলিপাইনে আরসিবিসি ব্যাংকের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর রায় দেয়া হয়েছে, তাই মামলা আমাদের পক্ষে আসবে, এমনটাই প্রত্যাশা। আর বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোরভাবে নজর রাখতে হবে। কারণ এখনও প্রায় ৫৫৭ কোটি টাকা উদ্ধার হয়নি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি দক্ষতা বাড়ানো ও দক্ষ জনবল নিয়োগ অন্যতম। এছাড়াও রিজার্ভের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে কঠোর নজরদারি করতে হবে।

প্রসঙ্গত, নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে জমা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ২০১৬ সালে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার নিয়ে যায় হ্যাকাররা। স্থানীয় মুদ্রায় যা ৮১০ কোটি টাকা।

হ্যাকাররা ‘নেসট্যাগ ও ম্যাকট্রাক’ নামক ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে সুইস নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে ওই অর্থ চুরি করে। এর মধ্যে ২ কোটি ডলার শ্রীলংকার একটি অ্যাকাউন্টে পাঠানো হলেও বানান ভুলের কারণে তা ফেরত এসেছে। বাকি অর্থ ফিলিপিন্সের মাকাতি শহরে রিজাল ব্যাংকের শাখায় চারটি ভুয়া অ্যাকাউন্টে যায়।

সেখান থেকে দ্রুত অর্থ উত্তোলন করে তা ক্যাসিনোর মাধ্যমে দুর্বৃত্তদের হাতে চলে যায়। এর মধ্যে দেড় কোটি ডলার ইতিমধ্যে উদ্ধার করেছে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোসহ কয়েকজন দায়ী। এদের ৫৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ফিলিপাইনের আদালত। এই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকও রিজাল ব্যাংক এবং এর কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করল নিউইয়র্কের আদালতে।