মাসিক নিয়ে ‘রাখঢাক’ কমছে

ঋতুস্রাব বা মাসিক বিষয়টি একসময় ‘ট্যাবু’ বা নিষিদ্ধ বিষয় বলেই বিবেচিত হতো। তবে এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীরা কথা বলছে। মাসিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানান উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তারাই স্বীকার করেছেন, দেরিতে হলেও সরকারের চিন্তাভাবনায় মাসিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া শুরু করেছে।

চলতি বছরের জুনে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে ‘ম্যান্সট্রুয়াল হাইজিন ম্যানেজমেন্ট অ্যামং বাংলাদেশি অ্যাডলোসেন্ট স্কুল গার্লস অ্যান্ড রিস্ক ফ্যাক্টরস অ্যাফেক্টিং স্কুল অ্যাবসেন্স: রেজাল্টস ফ্রম আ ক্রস-সেকশনাল সার্ভে’ শীর্ষক নিবন্ধে বলা হয়েছে, মাসিকের কারণে দেশের ৪১ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী মাসে গড়ে প্রায় তিন দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। প্রায় ৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থীই মাসিকের সময় স্কুলে অস্বস্তিতে ভোগে। ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, শুধু মাসিকের কারণে লেখাপড়াসহ স্কুলের অন্যান্য কার্যক্রমে পিছিয়ে পড়ছে। জরিপের জন্য ২০১৩ সালের মার্চ থেকে জুন মাসে ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সী মেয়েদের তথ্য নেওয়া হয়। এতে শহর ও গ্রামের ৭০০ বিদ্যালয়ের ২ হাজার ৩৩২ জন শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

 সরকারি উদ্যোগ

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক জানান, বর্তমানে সারা দেশে কো-এডুকেশনের (ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গে পড়ছে) তিন হাজার বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে। চারতলা ভবনের প্রতি তলায় ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা ওয়াশ ব্লক, মেয়েদের ব্লকে মাসিকের স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলার জন্য পৃথক ঝুড়ি (বিন) যাতে রাখা হয়, সে নির্দেশনা দেওয়া আছে। মাসখানেকের মধ্যে পুরোদমে কাজ শুরু হবে।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের শুধু কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় মোট ৪৫টি (দুটি মাদ্রাসাসহ) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের জন্য শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে।

কিশোরগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগারসহ সার্বিক অবকাঠামো ভালো। সেই তুলনায় মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো দুর্বল। অথচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাধ্যমিক স্তরে, অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই শিক্ষার্থীদের মাসিক শুরু হয়। স্কুলে অনুপস্থিতি রোধ ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে মাসিক ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতেই হবে এবং নজর দেওয়া শুরু হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ষষ্ঠ শ্রেণির শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বইটিতে ঋতুস্রাব বা মাসিককে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, সাধারণত ৯ থেকে ১২ বছর বয়সে মেয়েদের মাসিক শুরু হয়। মাসিক হলে কী ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, স্যানিটারি প্যাড বা কাপড় পরার নিয়ম বলে দেওয়া হয়েছে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে ৪ হাজার ৮৮৩টি কিশোর-কিশোরী ক্লাব উদ্বোধন করেছে। এ ক্লাবের সদস্যরা মাসিকসহ অন্যান্য প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করবে।

বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগ

নেত্রকোনায় নেদারল্যান্ডস সরকারের সহায়তায় ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অব দ্য রুরাল পুওরসহ (ডরপ) চারটি সংগঠন যৌথভাবে ঋতু প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প পরিচালনা করছে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নেত্রকোনার ৮টি উপজেলায় ৮৯টি বিদ্যালয়ে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ প্রকল্পের আওতায় স্কুলগুলোর (প্রাথমিক বিদ্যালয় যদি সংযুক্ত থাকে) ১০ থেকে ১৩ বছর বয়সের শিক্ষার্থীদের টার্গেট করা হয়েছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবকদের সচেতন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় চারজন ছাত্রছাত্রী নিয়ে ঋতু স্টুডেন্ট ফোরাম, বিদ্যালয়ে ঋতু ডেস্ক, বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা জানানোর জন্য অভিযোগ বাক্স রাখা, শৌচাগার পরিষ্কারের জন্য লোক নিয়োগসহ মাসিকবান্ধব শৌচাগারের জন্য বাজেট বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রকল্পে ‘যদি স্কুলের টয়লেট মাসিকবান্ধব হয়, তবে মাসিকে আর স্কুল কামাই নয়’ স্লোগান
প্রাধান্য পাচ্ছে।

ডরপের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আহমেদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মাসিকের সময় স্কুলে ছাত্রীদের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা দি হাঙ্গার প্রজেক্ট এবং জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম দেশের ৮টি বিভাগের ২০টি জেলার ১৮৫টি ইউনিয়নে ২০৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (১৮১টিতে ছেলে ও মেয়েরা একসঙ্গে পড়ছে) সেফ স্কুলস ফর গার্লস ক্যাম্পেইন শিরোনামে ২০১৬ সাল থেকে একটি প্রকল্প পরিচালনা করছে।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সেক্রেটারি নাছিমা আক্তার বলেন, এখন আর মাসিকের সময় সারা দিন স্যানিটারি প্যাড পরে থাকতে হচ্ছে না মেয়েদের। যে শিক্ষার্থীরা কাপড় ব্যবহার করে, তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলো শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ সময়ে মেয়েদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার বিষয়টিতে অভিভাবকদের সচেতন করা হচ্ছে।