মাশরাফি কি নামবেন রাজনীতিতে?

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য আজ আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা চেয়ে আবেদন করছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা ও সাকিব আল হাসান—সকালের এ খবরের রাতে আংশিক পরিবর্তন। গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে আজ সকালেই মাগুরা-১ আসনের জন্য মনোনয়ন চেয়ে আবেদন করার কথা জানিয়েছিলেন সাকিব। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই মতবদল, রাজনীতির মাঠ থেকে আপাতত দূরে থাকছেন তিনি। তবে মাশরাফির মত পরিবর্তনের খবর গত রাত পর্যন্ত মেলেনি।

ক্রিকেটারদের সংসদ সদস্য হওয়া নতুন কিছু নয়। অর্জুনা রানাতুঙ্গা তো মন্ত্রীও হয়েছেন। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয় দ্বিতীয় মেয়াদে সংসদ সদস্য হওয়ার রেসে নামার জন্য প্রস্তুত। তবে এঁদের সঙ্গে মাশরাফি-সাকিবের পার্থক্য হলো, তাঁরা এখনো অবসরে যাননি। অবশ্য সে তো শচীন টেন্ডুলকারও সংসদ সদস্য হয়েছিলেন খেলোয়াড়ি জীবনেই। না, একটু পার্থক্য আছে। ভারতীয় সংবিধানের বিশেষ বিধিবলে মনোনীত হয়ে ২০১২ সালের জুনে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন টেন্ডুলকার। সেখানে মাশরাফিকে সংসদে যেতে হবে গণমানুষের ভোটে জয়ী হয়ে। ভোটের চাপ সব কালেই প্রবল চাপ!

চাপে তো এ জীবনে কম ভোগেননি মাশরাফি। প্রতিটি ম্যাচ, ম্যাচের মোড় থেকে শুরু করে ক্রিকেট ম্যাচের প্রতিটি বলেই তো ভাগ্য লেখা থাকে। সঙ্গে মুহুর্মুহু ধেয়ে আসা ইনজুরি জীবনের কঠিনতম পরীক্ষা নিয়েছে মাশরাফির। সেই তিনিই রাজনীতির মাঠে নামার পূর্বপ্রস্তুতিকালে কিনা ঘর অন্ধকার করে বসে আছেন! টিপ্পনী শুনে তাঁর উত্তর, ‘ভাই, ওটা (রাজনীতি) অনেক বড় দায়িত্ব।’ ওদিকে বরাবর প্রবল চাপেও নির্ভার দেখা যায় সাকিব আল হাসানকে। সুসময়-দুঃসময়ে সমান হাসি তাঁর ট্রেডমার্ক। হয়তো এটা বিশ্বাস করেন যে, সুসময় আসবেই। সাকিবের ক্যারিয়ারে এমনিতে দুঃসময় সেভাবে আসেনি। আর এলেও সময়ের চাকা ঘুরতেই সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়েছে সুসময়। নির্বাচনের টিকিট চাওয়ার পথ থেকে শেষ মুহূর্তে সরে আসার আগে জানিয়েছিলেন জন্মস্থান মাগুরা-১ আসনের টিকিট চাওয়ার ইচ্ছার কথা। তবে সে আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী থাকায় এ তারকা অলরাউন্ডারকে ঢাকার কোনো একটি আসনেও মনোনয়ন দিতে পারে পার্টি—এমন গুঞ্জন শুনে সাকিবের নিস্তরঙ্গ প্রতিক্রিয়া, ‘দেখি না কী হয়!’ মাশরাফির অবশ্য দেখাদেখির কিছু নেই, আসন নিশ্চিত—নড়াইল-২।

রাত পোহালেই ধানমণ্ডির পার্টি অফিসে যাবেন সংসদ নির্বাচনের টিকিট পেতে—চিরায়ত এমন পরিস্থিতির সঙ্গে কোনো মিল নেই মাশরাফির বেলায়। একটি আবশ্যিক প্রস্তুতি অবশ্য নিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক, ‘সাকিব বলেছে সঙ্গে করে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে যেতে।’ এ খরচটা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কেনা বাবদ।

এদিকে মাশরাফি ও সাকিবের নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতির খবর প্রচার হওয়ার পর থেকেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া সোশ্যাল মিডিয়ায়। বিশেষ একটি দলের ব্যানারে মনোনয়ন প্রত্যাশা করার এ প্রতিক্রিয়া অপ্রত্যাশিতও নয়। মত পাল্টে আপাতত সে প্রতিক্রিয়ার উত্তাপ এখন আর গায়ে নিতে হচ্ছে না সাকিবকে। তবে দেখার বিষয়, এত দিন ‘সর্বদলীয়’ সমর্থন পেয়ে অভ্যস্ত মহাতারকা মাশরাফি সমালোচনার এ ‘বাউন্সার’ কিভাবে সামাল দেন। তবে সমর্থনের উত্থান-পতন তো আর কম দেখেননি তিনি। হাবে-ভাবে মনে হলো, মাশরাফি তৈরি এ বৈরিতাকে সামলে আবারও জনপ্রিয়তার চূড়ায় বসতে। ‘কাজ ভালো করলে সব ভালো। আর খারাপ করলে কারো জন্যই ভালো না’, লক্ষ্য পূরণে আশাবাদীও মাশরাফি।

জনসমর্থনে সাময়িক ভাটা না হয় রাজনীতির মাঠে দুর্দান্ত একটি ‘স্পেল’ দিয়ে জোয়ারে পরিণত করা গেল। কিন্তু রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর সময়টা কোথায় মাশরাফি কিংবা সাকিবের? সাকিব আল হাসান অলরাউন্ডার। ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং; সবই করেন। ক্রিকেট আর রাজনীতির ‘অলরাউন্ড’ দায়িত্ব পালনের উপায়ও হয়তো সে কারণেই বের করে রেখেছেন তিনি, ‘ক্রিকেট আর রাজনীতি কিভাবে একসঙ্গে করব? এ প্রশ্নের উত্তরটা দুই দিন পরে দেব।’ এ সময়কালের মধ্যে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করবে। তাহলে কি রাজনীতিতে নাম লিখিয়ে খেলার মাঠ থেকে সরে দাঁড়াবেন সাকিব? ‘সে রকম কোনো সম্ভাবনা নেই’, একদিকে হেলে পড়ার ইঙ্গিত দিয়ে রাতেই রাজনীতির মাঠে নামার সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছেন সাকিব।

মাশরাফির ক্রিকেটসূচি অতটা আঁটসাঁট নয়। শুধু ওয়ানডে খেলছেন। তবে আর মাত্র মাস সাতেক পরই বিশ্বকাপ। তাই খেলা না থাকলেও বিশ্বকাপ ভাবনা থেকে মুক্তি নেই মাশরাফির। এ অবস্থায় নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার ঝক্কি সামলানো সহজ ব্যাপার নয় মোটেও। ঘর অন্ধকার করে গতকাল সন্ধ্যায় সেসবই ভাবছিলেন মাশরাফি। হাজারটা প্রশ্নের একটা-দুটোর খণ্ডিত উত্তরে যেটুকু ইঙ্গিত মিলল, তাতে এটা পরিষ্কার যে, জীবনে আরেকবার সাদা পোশাকে মাঠে নামার দূরতম আশাও পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। ওয়ানডে থেকে অবসরের ‘ঠিকানা’ কি খুব কাছেই দেখতে পাচ্ছেন মাশরাফি? এমন প্রশ্নের উত্তরে, ‘জীবনে যা করব, মন দিয়ে করব’, নিজের জীবনদর্শন শুনিয়ে অতিথি বিদায় করলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা।