দুর্গে নিশ্চুপ বিএনপি, বিদ্রোহী নিয়ে বিপাকে আ.লীগ

‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত বগুড়ায় বিএনপি নিশ্চুপ। নির্বাচনে জিততে নানা কৌশল নিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তবে অতটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে না তারা। কারণ নিজ দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা তাদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আবার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতারাও নৌকার প্রার্থীর মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

সোমবার বগুড়ার ১২ উপজেলায় ভোট হবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে এই ১২ উপজেলাতেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপির ৭ জন ও জামায়াতের ৫ জন। দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে এবার বিএনপি ও জামায়াতের এই ১২ জন চেয়ারম্যান ভোটের মাঠে নেই।

এর মধ্যে শেরপুর ও আদমদীঘি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় সেখানে শুধু ভাইস চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন হবে। এই দুই উপজেলার মধ্যে শেরপুরে বর্তমান চেয়ারম্যান জামায়াতের আর আদমদীঘিতে বিএনপির। অন্য ১০ উপজেলার মধ্যে বগুড়া সদর, গাবতলী, সারিয়াকান্দি, ধুনট, সোনাতলা ও শাহজাহানপুরে বর্তমান চেয়ারম্যান বিএনপির এবং শিবগঞ্জ, কাহালু, দুপচাঁচিয়া ও নন্দীগ্রামের বর্তমান চেয়ারম্যান জামায়াতের।

ভোটের মাঠে দলীয়ভাবে না থাকলেও বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা–কর্মী ভোটের মাঠে আছেন। তাঁদের অনেকেই ভোটযুদ্ধে শক্ত অবস্থানে আছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে। সূত্রমতে, চারটি উপজেলায় বিএনপির বহিষ্কৃত প্রার্থীরা শক্ত অবস্থানে আছেন। এর মধ্যে সোনাতলা উপজেলায় উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক জিয়াউল হকের সঙ্গে লড়াই হবে নৌকার প্রার্থী সাংসদ আবদুল মান্নানের শ্যালক মিনহাদুজ্জামান লিটনের। বগুড়া সদরে বিএনপির বহিষ্কৃত সভাপতি মাফতুন আহমেদ খানের সঙ্গে লড়াইয়ে আছেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু সুফিয়ানের সঙ্গে। বিএনপি–সমর্থক এ কিউ এম ডিসেন্ট আহমেদ গাবতলীতে প্রার্থী হয়েছেন। জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান গাবতলীতে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বগুড়া শহর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক রফি নেওয়াজ খান। শাজাহানপুরে উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত আহবায়ক আবুল বাশারের সঙ্গে লড়াইয়ে আছেন উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন।

বিদ্রোহী নিয়ে বেকায়দায় নৌকা!

সারিয়াকান্দি উপজেলায় নৌকার প্রার্থী আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির উপদেষ্টা মুনজিল আলী সরকার। তাঁর অভিযোগ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বগুড়া–১ আসনের সাংসদ আবদুল মান্নানের স্ত্রী সাহাদার মান্নানের বিরুদ্ধে। মুনজিল বলেন, সাংসদপত্নী দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন এবং প্রশাসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। যদিও সাহাদারা মান্নান এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। সেখানে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজাহান আলী। উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ সমর্থন দিচ্ছেন আবদুস সালামকে। আবার আঞ্চলিকতার জেরে শাহজাহান আলীও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে আওয়ামী লীগের ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কাজে লাগাতে তৎপর বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক পৌর মেয়র টিপু সুলতান।

ধুনটে নৌকার প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হাই হলেও তাঁর পথে কাঁটা মনে করা হচ্ছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাসুদুল হককে। মাসুদুল হক রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ জানিয়েছেন। এঁদের সঙ্গে ভোটের মাঠে লড়ছেন ধুনট পৌর বিএনপির বহিষ্কৃত সভাপতি আলীমুদ্দিন হারুন মণ্ডল ।

দুপচাঁচিয়ায় নৌকার প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিজানুর রহমান খানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী দুজন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ প্রামাণিক। সেখানে বিএনপির সাবেক নেতা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এ এইচ এম নুরুল ইসলাম খান মাঠে আছেন।

কাহালু উপজেলায় নৌকার প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র হেলাল উদ্দিন কবিরাজের ছেলে আল হাসিবুল হাসান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশফিকুর রহমান ভোটের মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী।

নন্দীগ্রামে নৌকা প্রতীক পেয়েছেন উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি রেজাউল আশরাফ। সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আজিজুর রহমান। তাঁদের সঙ্গে লড়বেন জেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সহসভাপতি এস এম আবদুর রাফি পান্না।

শিবগঞ্জ উপজেলায় নৌকার প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুল হক। মাঠে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি মজিবুর রহমানের ছেলে ও রায়নগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ। জেলা মহিলা দলের বহিষ্কৃত যুগ্ম সম্পাদক বিউটি বেগম আছেন তাঁদের সঙ্গে।

নির্বাচন বর্জনের ডাক বিএনপির
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনবিরোধী অবস্থান নেওয়া হয়। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কার করা হয় ৩০ নেতাকে। নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানিয়ে ভোটারদের নিরুৎসাহিত করতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্র কমিটি করেছে দলটি। বগুড়া–৪ আসন থেকে বিএনপির সাংসদ (এখনো শপথ নেননি) মোশারফ হোসেনের ভোট বর্জনের আহ্বান–সংবলিত একটি পোস্টার সাঁটানো হয়েছে নন্দীগ্রামে। তবে সাংসদ এই পোস্টার লাগানোর বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি জনগণকে ভোট বর্জনে উৎসাহিত করতে কমিটি করেছে। যেসব কেন্দ্রে ভোট কম পড়বে সেসব কেন্দ্রের দলীয় নেতা–কর্মীদের সাংগঠনিকভাবে পুরস্কৃত করার কথাও আমরা বলেছি।’

টানা দুবার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরও এবার ভোটে প্রার্থী হননি বগুড়া সড়র উপজেলার বর্তমান চেয়ারম্যান আলী আসগর হেনা। বগুড়া জেলা বিএনপির এই সহসভাপতি এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে ভোটে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আছে। এ ছাড়া নির্বাচনকে বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশন যে পর্যায়ে নিয়ে গেছে, সেখানে নির্বাচন করার কোনো মানে হয় না। কাহালু উপজেলা চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা তায়েব আলীও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের কথা জানালেন।

বিএনপির নেতারা মনে করেন, ভোটাররা ভোট দিতে যাবে না। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান বিএনপির দুর্গ। এই দুর্গে আওয়ামী লীগ খালি মাঠে গোল দেবে বলে মনে করেন তাঁরা।

জয়-পরাজয়ে ফ্যাক্টর জামায়াত
২০১৪ সালে বগুড়ার শেরপুর, নন্দীগ্রাম, দুপচাঁচিয়া, শিবগঞ্জ ও কাহালু উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছিলেন জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরা। এবার দলটি কোনো প্রার্থী দেয়নি। এই পাঁচ উপজেলার মধ্যে শেরপুরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যেই বিজয়ী হওয়ার পথে। অন্য চারটির মধ্যে কাহালু উপজেলায় জামায়াতের সমর্থন আদায়ে তৎপর স্বতন্ত্র প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ সভাপতির ছেলে হাসিবুল হাসান। নন্দীগ্রাম উপজেলাতেও জামায়াতের সমর্থন আদায়ে তৎপর স্বতন্ত্র এক প্রার্থী। শিবগঞ্জে জামায়াতের সমর্থন আদায়ের তৎপরতা চালচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ফিরোজ আহমেদ। তবে এখন পর্যন্ত সব উপজেলাতেই জামায়াত নিশ্চুপ। কাহালু উপজেলার বর্তমান চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা তালেব আলী বলেন, ‘আমরা ভোট দিতে যাব না। আর কাউকে সমর্থন করার প্রশ্নই আসে না, কারণ আমরা ভোট বর্জন করেছি।’

বিএনপির বহিষ্কার তালিকা দীর্ঘ
দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় এবং তৎপরতা চালানোয় জেলা ও উপজেলা বিএনপির ৩০ প্রভাবশালী নেতা বহিষ্কার হয়েছেন। তাঁরা হলেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মীর শাহে আলম, সহসভাপতি রাফি পান্না, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান, শিবগঞ্জ উপজেলা উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব এস এম তাজুল ইসলাম, সারিয়াকান্দি উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. মাছুদুর রহমান, বগুড়া জেলা বিএনপির সদস্য ও সারিয়াকান্দি পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. টিপু সুলতান, সারিয়াকান্দি উপজেলা বিএনপির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক গোলাপী বেগম, সোনাতলা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জিয়াউল হক, উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি রঞ্জনা খান ও সাংগঠনিক সম্পাদক নয়ন তারা, জেলা বিএনপির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মোছা. বিউটি বেগম, নন্দীগ্রাম উপজেলা যুবদলের সভাপতি আলেকজান্ডার, উপজেলা বিএনপির সভাপতি এ কে আজাদ, কাহালু উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি শাহাবুদ্দিন, উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি মমতাজ আরজু কবিতা, ধুনট পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি আকতার আলম সেলিম, পৌর বিএনপির সভাপতি আলিমুদ্দিন হারুন, বগুড়া সদর উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি মোছা. নাজমা আক্তার, সদর উপজেলা বিএনপির সাবেক সম্পাদক মো. মাহিদুল ইসলাম, শাজাহানপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. আবুল বাশার, যুগ্ম আহ্বায়ক মো. জাহেরুল ইসলাম, শাজাহানপুর উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো. সুলতান আহম্মেদ, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোছা. জুলেখা বেগম, উপজেলা মহিলা দলের সহসভাপতি মোছা. কোহিনুর বেগম, উপজেলা মহিলা দলের রহিমা খাতুন, জেলা ছাত্রদলের সহ স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক মেহেরুল আলম, গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য মো. আনোয়ার এহসানুল বাশার, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সুরাইয়া জেরীন, গাবতলী উপজেলা মহিলা দলের সদস্য সহমিনা আকতার এবং উপজেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক কমিশনার শ্যামল সরকার।