দুই ব্যাংকের কোটি টাকা হাতিয়ে নিল প্রতারক চক্র

একজন অসুস্থ ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজের ছবি সংযোজন করে দুটি ব্যাংক থেকে অন্তত এক কোটি ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। গত ৭ ও ১০ ফেব্রুয়ারি ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে সিসি ও টার্ম লোন দেখিয়ে ৬০ লাখ এবং প্রাইম ব্যাংক থেকে ২০ ও ২৪ জানুয়ারি ৫০ লাখ টাকা নিয়ে গা ঢাকা দেয়।

পরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের জালিয়াতির মামলার সূত্র ধরে এরই মধ্যে চক্রের অন্যতম হোতা শিহাব উদ্দিন, আবদুল লতিফ ওরফে রুবেল ও আবদুস সামাদ রাসেলকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। চক্রটির বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, এনআইডিসহ কাগজপত্র জাল করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য রয়েছে পুলিশের কাছে।

গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, চক্রের মূল হোতা আবুল কালাম আজাদকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। যতটুকু জানা গেছে, এই চক্রে অন্তত ১৫ জন সদস্য সক্রিয় রয়েছে। নিউমার্কেট থানায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মামলার তদন্তের সূত্র ধরে প্রাইম ব্যাংক থেকে জালিয়াতি তথ্য উদঘাটিত হয়। পরে প্রাইম ব্যাংক বনানী থানায় মামলা করে।

কথা হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার হান্নানুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে জানতে পারি, রাজধানীর ভাটারার ১০০ ফিট এলাকায় ৫০ শতাংশ জমির প্রকৃত মালিক আবদুল আলিম। জমিটিতে শুধু সাইনবোর্ড দেয়া আছে। তিনি উত্তরায় থাকেন। অসুস্থতার কারণে তিনি বর্তমানে সাভারে সিআরপিতে চিকিৎসাধীন। আবদুল আলিমের জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) শিহাব উদ্দিনের ছবি সংযুক্ত করে এই জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়।

আবদুল আলিমের জমির দলিল হুবহু নকল করে শিয়াব উদ্দিনের নামে নেয়া হয় দোকান ভাড়া, করা হয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, টিআইএন, ট্রেড লাইসেন্সসহ ওই নামে সব কাগজপত্র তৈরি করে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করা হয়। এই চক্রের মূল হোতা আবুল কালাম আজাদ চাকরি করতেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে।

জালিয়াতির কারণে তার চাকরি চলে যায়। পরে তিনি এই চক্রটি গড়ে তোলেন। পুলিশ কর্মকর্তা হান্নানুল বলেন, ব্যাংক থেকে এনআইডি ভেরিফিকেশনও করা হয়েছে। তবে ব্যাংকের কেউ জড়িত আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক নিউমার্কেট থানায় যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজি হননি।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মামলার বাদী শেখ মাহমুদ হাসান বলেন, যা আছে এজাহারে আছে। এর বাইরে আমরা কোনো কথা বলতে পারব না। সূত্র জানায়, টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ব্যাংক থেকে আবদুল আলিম পরিচয়ধারী শিহাব উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরই সব ফাঁস হয়ে যায়। যোগাযোগের সব ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

জামিনদার এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ঋণের আবেদনের উল্লেখিত অফিসে গিয়ে সব তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। ১২ মার্চ মামলার পর গ্রেফতার করা হয় শিয়াব উদ্দিনসহ তিন ব্যক্তিকে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তারা সবাই জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাতের কথা স্বীকার করেছেন।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মামলায় শিহাব উদ্দিন, আবুল কালাম আজাদ, মুনসুর আলী রাজু, ইসমত আরা খাতুন, আবদুল লতিফ রুবেল, আবদুস সামাদ রাসেল, মো. সামির হোসেন তালুকদার, মহিমা কলি, আলাউদ্দিনসহ অজ্ঞাত আরও ৮-১০ জনকে আসামি করা হয়। গত ১৩ মার্চ লালবাগ এলাকা থেকে শিহাব উদ্দিন, আবদুল লতিফ ওরফে রুবেল ও আবদুস সামাদ রাসেলকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

জিজ্ঞাসাবাদে শিহাব উদ্দিন চক্রের মূল হোতা হিসেবে আবুল কালাম আজাদের কথা স্বীকার করেছেন। ২০০৫ সাল থেকে আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ। আজাদ নিউ এলিফ্যান্ট রোডে ‘কটন জোন’ নামে তৈরি পোশাকের একটি অফিস নেন। সেখানেই পরিচয় আবদুল লতিফ রুবেলসহ অন্যদের সঙ্গে। আজাদের মাথা থেকেই ব্যাংক লোনের বিষয়টি আসে। জালিয়াতির এক কোটি ১০ লাখ টাকার মধ্যে আমাকে ১৮ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে।

প্রাইম ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের কাহিনী বর্ণনা করে জিজ্ঞাসাবাদে শিহাব উদ্দিন পুলিশকে জানিয়েছেন, শুরুতে ব্যাংকের সেলস অফিসার হাফিজুর রহমানকে ‘কটন জোন’ অফিসে নিয়ে আসা হয়। তাকে সব কাগজপত্র দেখানো হলে হাফিজুর ৭০-৭৫ লাখ টাকা লোন দেয়া যেতে পারে বলে জানান।

তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংক লোনের আবেদনপত্র ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাগজপত্র প্রস্তুত করে হাফিজুর রহমানকে দেয়া হয়। পরে ব্যাংকের কর্মকর্তারা অফিস, জমি, শোরুম পরিদর্শন করে ৫০ লাখ টাকা লোন মঞ্জুর করেন। গত ২০ জানুয়ারি ২৫ লাখ ও ২৪ জানুয়ারি ২৫ লাখ টাকা তুলে নেয়া হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. মশিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এনআইডি নকল করায় প্রতারণা করা তাদের জন্য সহজ হয়েছে। বৈধভাবে একটি এনআইডি করতে গেলে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আর একই লোক ভিন্ন পরিচয় দিয়ে একাধিক এনআইডি কার্ড তৈরি করবে- এটা সত্যিই দুঃখজনক। এনআইডি কার্ড তৈরির দুর্বলতার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে চুরি হয়ে যাওয়ার একটা সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে।

এই চক্রের সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সার্ভারে একজনের ডাটাবেজে অন্যজনের ছবি বসানো একেবারেই অসম্ভব। ব্যাংক যখন ভেরিফিকেশন করে তখন এনআইডি নম্বর আমাদের কাছে পাঠায়, ভেরিফাই করে তখন আমরা ইয়েস বা নো বলি। কিন্তু ছবি দেখে তো আমরা আইডেন্টিফাই করি না।

তিনি বলেন, ঠিক আছে, এটা নিয়ে অফিসে আসেন আমরা ভেরিফাই করে দেখি। বনানী থানায় মামলা নিয়ে জানতে চাইলে প্রাইম ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (জনসংযোগ বিভাগের প্রধান) মনিরুজ্জামান টিপু যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি আমার নলেজে নেই, খোঁজ নিয়ে জানাতে পারব। তিনি বলেন, এক ব্যাংক থেকে লোন নেয়ার পর একই কাগজে অন্য ব্যাংক থেকে লোন নেয়া অসম্ভব। কথা হয় বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে।

তিনি যুগান্তরকে বলেন, প্রাইম ব্যাংক মহাখালী শাখা থেকে একটি ঋণ জালিয়াতির মামলা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছেন এসআই শাহীন আলম। যোগাযোগ করা হলে, শাহীন আলমও এর সত্যতা স্বীকার করেন।